সিলেটের করিমগঞ্জ যখন শ্রীভূমি
যেভাবে বাংলাদেশের করিমগঞ্জ নিজেদের দখলে নেয় হিন্দুত্ববাদী ভারত
.
ভারত দখলকৃত করিমগঞ্জ এমন একটি অঞ্চল, যার মাটির নিচে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে গ্যাস ও তেলক্ষেত্র লুকিয়ে আছে। করিমগঞ্জে ভারতের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র অবস্থিত। এ ছাড়া এখানকার চা-বাগানও বিশ্ববিখ্যাত।
.
বর্তমানে করিমগঞ্জ ভারতের আসাম রাজ্যের একটি জেলা হলেও একসময় এটি ছিল সম্পূর্ণ সিলেটের অংশ। প্রায় ১,৮৮৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলা আমাদের গাজীপুর জেলার চেয়েও বড়।
.
মজার বিষয় হলো, আসামের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে করিমগঞ্জের দূরত্ব প্রায় ৩৩০ কিলোমিটার। অথচ বাংলাদেশের সিলেট শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৫০ কিলোমিটার।
.
কুশিয়ারা নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলের প্রায় ৮৭ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। এখানকার জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ মুসলিম। দেশভাগের সময় মুসলিমদের সংখ্যা আরও বেশি ছিল।
.
কিন্তু সিলেটের এই অঞ্চলটি কীভাবে ভারত দখল করে নিলো ? তা জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৮৮৫ সালে।
.
তৎকালীন বাংলা সুবাহর দেওয়ানি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে গিয়েছিল। সিলেটও তখন ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। তবে ব্রিটিশরা সহজে সব অঞ্চলের বিশেষ করে করিমগঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।
.
পরবর্তীতে ১৭৮৬ সালে ব্রিটিশরা সমগ্র করিমগঞ্জে নিজেদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এরপর অনেক সময় পেরিয়ে যায়। সিলেটের প্রশাসনিক কাঠামো গঠিত হলে করিমগঞ্জকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি মহকুমা হিসেবে সিলেটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
.
সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। বাংলার অংশ হিসেবে সিলেটের মানুষও বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশরা আসাম নামে নতুন একটি প্রদেশ গঠন করে। উক্ত প্রদেশে উচ্চশিক্ষিত জনসমাজ ও শক্তিশালী অর্থনীতির অধিকারী সিলেটকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে ব্রিটিশ সরকার।
.
কিন্তু সিলেটের মানুষ শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তাঁরা পূর্ববাংলার সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন। পরে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় সিলেটকে আবার বাংলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
.
১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর সিলেটকে আবার জোরপূর্বক আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এভাবেই করিমগঞ্জও আসামের অংশ হিসেবে জোরপূর্বক অন্তর্ভুক্ত হয়।
.
.
তবে আসল ঘটনা শুরু হয় ১৯৪৭ সালের দিকে।
ব্রিটিশরা তখন ভারত ছেড়ে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক দেশ গঠনের পরিকল্পনা করা হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী, মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো ভারতের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু আসামকে হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে ভারতের ভাগে রাখা হয়েছিল। ফলে প্রশ্ন দেখা দেয়, আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেটের কী হবে?
.
সিলেট তখন আসামের একটি অংশ হলেও সেখানকার অধিকাংশ মানুষ ছিলেন মুসলিম। এ নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। অবশেষে ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আয়োজন করা হয় ঐতিহাসিক গণভোট।
.
১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই সিলেটে ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ব্যালট পেপারে দুটি সাধারণ প্রতীক রাখা হয়েছিল। একটি ছিল কুড়াল, যা পাকিস্তান বা মুসলিম লীগের প্রতীক। অন্যটি ছিল কুঁড়েঘর, যা ভারত বা কংগ্রেসের প্রতীক।
.
মোট ভোটার ছিলেন ৬ লাখ ৪০ হাজার ৮১৫ জন। ভোটের ফলাফলে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পড়ে কুড়াল প্রতীকে। অর্থাৎ করিমগঞ্জসহ পুরো সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ রায় দেয়—তারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চায়।
.
গণভোটের ফলাফলের পর আর কোনো রাজনৈতিক বা আইনি বাধা থাকার কথা ছিল না। স্বাভাবিক নিয়মে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও করিমগঞ্জ মহকুমাসহ সিলেটের পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হওয়ার কথা ছিল।
.
.
কিন্তু না ? পিছনে আরেকটি ষড়যন্ত্র তখন চলছিলো।
তখন ব্রিটিশ ভারতের সীমান্ত নির্ধারণের জন্য ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্যার সিরিল র্যাডক্লিফকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এসময় মুসলিমবিদ্বেষী ভারতীয় কংগ্রেস নেতাদের সাথে গোপন বৈঠক করে করিমগঞ্জকে ভারতের সাথে যুক্ত করার ষড়যন্ত্র করেন র্যাডক্লিফ।
.
ফলস্বরুপ ১৯৪৭ সালের ১২ আগস্ট র্যাডক্লিফ লাইন প্রকাশ হওয়ার পর দেখা গেল, গণভোটের রায় সত্ত্বেও সিলেটের করিমগঞ্জ, রাতাবাড়ি ও পাথারকান্দিসহ প্রায় তিনটি থানা চলে গেছে ভারতের আসাম রাজ্যের অংশে।
.
অঞ্চলটি মুসলিম-অধ্যুষিত হওয়া এবং সেখানকার মানুষ সরাসরি বাংলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়া সত্ত্বেও শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত করিমগঞ্জের মানুষের সঙ্গে বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল।
.
.
কিন্তু করিমগঞ্জের মুসলিমরা কি এত সহজে এই অন্যায় মেনে নিয়েছিলেন? একেবারেই না।
করিমগঞ্জ মহকুমার এসডিও ছিলেন এম এ হক, যিনি পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ভূমিমন্ত্রীও হয়েছিলেন। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর তিনি করিমগঞ্জ থানায় পাকিস্তানের পতাকা তুলেছিলেন। সিলেটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তিনি একের পর এক টেলিগ্রামও পাঠিয়েছিলেন।
.
.
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি বদলায়নি।
এম এ হক প্রতিদিন বার্তা পাঠাতেন। তাঁর আশা ছিল, হয়তো আজই সাহায্য আসবে; হয়তো আজই বাহিনী এসে করিমগঞ্জকে হিন্দুত্ববাদী ভারতের হাত থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু কেউ আসেনি।
.
এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ কেটে যায়। ভারতীয় দখলদার বাহিনী ধীরে ধীরে করিমগঞ্জ শহরে প্রবেশ করতে শুরু করে। চারদিক থেকে তারা শহরটি ঘিরে ফেলে। এম এ হক তখন সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েন।
.
ক্ষুধা, দুর্ভোগ, ভয় ও আতঙ্কের কারণে তিনি পুলিশ স্টেশন ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। এভাবেই বাংলাদেশের সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দেওয়া একটি মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চল ধীরে ধীরে হিন্দুত্ববাদী ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
.
হাজার বছর ধরে করিমগঞ্জের মাটিতে বসবাসকারী মুসলিমরা আজ অনেকটা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো জীবন কাটাতে হচ্ছে। ভারতের বর্তমান সরকার ও আসামের স্থানীয় প্রশাসনের পদক্ষেপে এসব মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছেন।
.
আসামের মুখ্যমন্ত্রী করিমগঞ্জের মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিহিত করেছেন। নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য তাঁদের কাছে বহু পুরোনো কাগজপত্র চাওয়া হচ্ছে।
.
নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কা সৃষ্টি করে এনআরসি ও সিএএর নামে তাঁদের হয়রানি করা হচ্ছে। অনেককে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
.
সম্প্রতি করিমগঞ্জের মুসলিম পরিচয় মুছে দিতে ভারত সরকার অঞ্চলটির নামও পরিবর্তন করেছে। করিমগঞ্জের নতুন নাম রাখা হয়েছে ‘শ্রীভূমি’। এই পরিবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো অঞ্চলটির ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলা।
.
এভাবে হায়দ্রাবাদ,সিকিম, কাশ্মীর এবং করিমগঞ্জের মতো বাংলাদেশকেও দখলে নিয়ে ইসলামি পরিচয় নিশ্চিহ্ন করতে চায় হিন্দুত্ববাদী ভারত।





