বাংলাদেশের হাকীম সমাজের উত্থান, সংকট ও ভবিষ্যৎ করণীয় ------ হাকিম আশরাফুল ইসলাম লিটন

বাংলাদেশের হাকীম সমাজের উত্থান, সংকট ও ভবিষ্যৎ করণীয
ঐতিহ্য, সংগ্রাম, বাস্তবতা ও পুনর্জাগরণের প্রত্যাশা
ভূমিকাঃ
একটি জাতির চিকিৎসা ঐতিহ্য শুধু রোগ নিরাময়ের ইতিহাস নয়; এটি সেই জাতির জ্ঞান, সংস্কৃতি, জীবনদর্শন ও সভ্যতার প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে ইউনানী চিকিৎসা এমনই একটি ঐতিহ্য, যার শিকড় হাজার বছরের জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। যুগে যুগে হাকীমরা শুধু চিকিৎসক হিসেবে নয়, সমাজের পথপ্রদর্শক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও মানবসেবক হিসেবেও ভূমিকা পালন করেছেন।
কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। একদিকে দেশে ইউনানী শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, নতুন নতুন স্নাতক তৈরি হচ্ছে, ভেষজ ওষুধ শিল্প সম্প্রসারিত হচ্ছে; অন্যদিকে হাজারো হাকীম বেকারত্ব, পেশাগত অনিশ্চয়তা, সামাজিক অবমূল্যায়ন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে—কেন এমন হলো? কোথায় আমাদের সাফল্য, কোথায় ব্যর্থতা? ভবিষ্যতের পথই বা কী?
বাংলায় ইউনানী চিকিৎসার আগমনঃ
ইউনানী চিকিৎসার মূল ভিত্তি গ্রিক চিকিৎসাবিদ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত। হিপোক্রেটিস, গ্যালেন, ইবনে সিনা, আল-রাজীসহ বহু মনীষীর গবেষণা ও চিকিৎসাদর্শনের সমন্বয়ে ইউনানী চিকিৎসা বিকশিত হয়।
মুসলিম শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে ইউনানী চিকিৎসার বিস্তার ঘটে। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে হাকীমরা জনগণের আস্থাভাজন চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তখন গ্রামাঞ্চলে হাসপাতাল ছিল না, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল সীমিত। ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা ছিলেন হাকীমরা।
তারা রোগীকে শুধু ওষুধ দিতেন না; খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, পরিবেশ ও মানসিক অবস্থাকেও চিকিৎসার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতেন। বর্তমান যুগে যাকে “হলিস্টিক মেডিসিন” বলা হয়, ইউনানী চিকিৎসা বহু আগ থেকেই সেই দর্শন ধারণ করে এসেছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাস্তবতাঃ
স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতি মূলত পাশ্চাত্য আধুনিক চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। ফলে ইউনানী চিকিৎসা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পিছিয়ে পড়ে।
তবে দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে ১৯৮৩ সালে ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের জন্য আইনি কাঠামো গড়ে ওঠে। নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হয়, শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয় এবং চিকিৎসকদের পেশাগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করার ভিত্তি তৈরি হয়।
পরে সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা ইউনানী চিকিৎসার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
হাকীম সমাজের অর্জনঃ
অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হাকীম সমাজ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন করেছে।
প্রথমত: প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠাঃ
এক সময় ইউনানী চিকিৎসা মূলত পারিবারিক বা ওস্তাদ-শাগরেদ পদ্ধতিতে শেখানো হতো। বর্তমানে DUMS / BUMS ডিগ্রির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত: চিকিৎসক হিসেবে স্বীকৃতিঃ
আজ একজন DUMS / BUMS ডিগ্রিধারী রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত চিকিৎসক। এটি দীর্ঘ আন্দোলন ও সংগ্রামের ফল।
তৃতীয়ত: ভেষজ শিল্পের বিকাশ|
বাংলাদেশে ইউনানী ও ভেষজ ওষুধ শিল্পের বিস্তারে হাকীমদের অবদান অনস্বীকার্য। আজ হাজার হাজার মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
চতুর্থত: জনসেবায় অবদান :
স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানের মাধ্যমে হাকীমরা এখনও দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
কেন হাকীম সমাজ পিছিয়ে পড়ল..?
এখানেই মূল প্রশ্ন।
শুধু রাষ্ট্রকে দোষারোপ করলে বাস্তবতা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।
১. গবেষণার প্রতি অবহেলা;
বিশ্বে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি গবেষণানির্ভর। কিন্তু ইউনানী চিকিৎসা খাতে গবেষণা কার্যক্রম খুবই সীমিত।
অনেক কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি ও ওষুধ রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ও আন্তর্জাতিক মানের ডকুমেন্টেশন পর্যাপ্ত নয়।
২. নেতৃত্বের সংকট;
হাকীম সমাজের অন্যতম বড় সমস্যা হলো নেতৃত্বের বিভাজন।
বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি, গ্রুপিং, পদ-পদবীর প্রতিযোগিতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস সংগঠনগুলোর কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে।
৩. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব;
অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠন যেখানে ২০-৩০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছে, সেখানে ইউনানী খাত অধিকাংশ সময় তাৎক্ষণিক দাবিদাওয়া নিয়েই ব্যস্ত থেকেছে।
৪. রাজনৈতিক নির্ভরতা:
কিছু ক্ষেত্রে পেশাগত শক্তির পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের উপর নির্ভরশীলতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
কর্মসংস্থানের করুণ বাস্তবতা:
বর্তমানে হাকীম সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট কর্মসংস্থান।
প্রতি বছর নতুন স্নাতক বের হলেও—
• পর্যাপ্ত সরকারি পদ নেই,
• নতুন ইউনানী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না,
• উপজেলা পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ নেই,
• গবেষণা প্রতিষ্ঠান সীমিত,
• শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মসংস্থানও অপ্রতুল।
•
ফলে অনেক শিক্ষিত হাকীম পেশার বাইরে চলে যেতে বাধ্য হন।
এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; রাষ্ট্রের জন্যও মানবসম্পদের অপচয়।
সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন:
দুঃখজনক হলেও সত্য, সমাজের একটি অংশ এখনও ইউনানী চিকিৎসাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয় না।
এর জন্য যেমন জনসচেতনতার অভাব দায়ী, তেমনি নিজেদের অর্জন ও গবেষণা যথাযথভাবে তুলে ধরতে না পারাও একটি কারণ।
আত্মসমালোচনার সময় এসেছে
হাকীম সমাজকে আজ একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে—
আমরা কি নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলো স্বীকার করতে প্রস্তুত..?
অন্যের দোষ খোঁজার আগে আমাদের দেখতে হবে—
• গবেষণায় আমরা কতটা এগিয়েছি..?
• নতুন প্রজন্মকে কতটা সুযোগ দিয়েছি..?
• সংগঠনকে কতটা গণতান্ত্রিক করেছি..?
• ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে কতটা উঠতে পেরেছি..?
•
যে জাতি আত্মসমালোচনা করতে পারে না, সে জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না।
ভবিষ্যতের করণীয়
গবেষণা বিপ্লব:
প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজে গবেষণা ইউনিট গঠন করতে হবে।
জাতীয় ডাটাবেইস:
দেশব্যাপী ইউনানী চিকিৎসার ফলাফল, রোগীর তথ্য এবং গবেষণা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি:
প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইউনানী চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
ভেষজ অর্থনীতি:
বাংলাদেশকে ভেষজ উদ্ভিদ উৎপাদন ও রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
তরুণ নেতৃত্ব:
সংগঠনগুলোতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সংযোগ:
ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের ইউনানী গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
উপসংহার:
বাংলাদেশের হাকীম সমাজের ইতিহাস গৌরবময়, বর্তমান সংগ্রামময় এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময়।
কিন্তু শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করে কোনো জাতি এগোতে পারে না। প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, গবেষণা, ঐক্য, দক্ষ নেতৃত্ব এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।
আজ যদি হাকীম সমাজ ব্যক্তি, দল ও গোষ্ঠীর সংকীর্ণতা অতিক্রম করে জ্ঞান, গবেষণা ও পেশাগত মর্যাদার ভিত্তিতে নতুন পথচলা শুরু করতে পারে, তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে তারা শুধু একটি ঐতিহ্যের ধারক নয়, বরং একটি আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও মানবকল্যাণমুখী চিকিৎসা ব্যবস্থার নির্মাতা হিসেবে পরিচিত হবে।
হাকীম সমাজের পুনর্জাগরণ কোনো স্বপ্ন নয়; এটি সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ ইচ্ছাশক্তি, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সত্যকে সত্য বলার সাহস।
হাকীম মোঃ আশরাফুল ইসলাম লিটন





