ব্যবসা বান্ধব এফবিসিসিআই গঠনের উপায় -----সাবিনা ইয়াসমিন সম্পাদক রোদেসা

দাবি নয়, যুক্তি: এফবিসিসিআই কীভাবে গড়তে পারে ব্যবসাবান্ধব রাষ্ট্রনীতি”
ব্যবসায়ীর উন্নতি মানেই রাষ্ট্রের অগ্রগতি
এফবিসিসিআই কীভাবে সরকারের কাছ থেকে ব্যবসাবান্ধব সুবিধা আদায় করতে পারে….
বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি কোথায়? উত্তরটি স্পষ্ট, ব্যবসা ও শিল্পখাতে। রাজস্ব, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয়, অবকাঠামো উন্নয়ন, সব কিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা। তাই একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করতে হবে: ব্যবসায়ীরা উন্নতি করলে সরকারও উন্নতি করে। কারণ ব্যবসা বাড়লে আয় বাড়ে, আয় বাড়লে কর বাড়ে, কর বাড়লে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ে। এই প্রেক্ষাপটে এফবিসিসিআই শুধু একটি সংগঠন নয়; এটি ব্যবসায়ী সমাজের সর্বোচ্চ নীতিগত প্ল্যাটফর্ম। প্রশ্ন হলো, এফবিসিসিআই কীভাবে সরকারের কাছ থেকে ব্যবসাবান্ধব সুবিধা আদায় করতে পারে? কীভাবে এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে ব্যবসার উন্নয়ন ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন একই স্রোতে প্রবাহিত হয়?
১. সরকার–ব্যবসা সম্পর্ক: বিরোধ নয়, অংশীদারিত্ব….
অনেক সময় ব্যবসায়ী ও সরকারকে দুই ভিন্ন শক্তি হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে তারা পরস্পর নির্ভরশীল। সরকার নীতি দেয়, ব্যবসা তা বাস্তবায়ন করে। সরকার অবকাঠামো গড়ে, ব্যবসা উৎপাদন বাড়ায়। সরকার কর নেয়, ব্যবসা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে।
এফবিসিসিআই এর প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই সম্পর্ককে “দাবি দাওয়া” থেকে “স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপে” উন্নীত করা। এর জন্য প্রয়োজন-
** নিয়মিত নীতি সংলাপ (Policy Dialogue),
** বাজেটপূর্ব সুপারিশ প্রক্রিয়া,
** খাতভিত্তিক সমস্যা তালিকা ও সমাধান রোডম্যাপ।
যদি সরকার বুঝতে পারে যে ব্যবসাবান্ধব নীতি মানেই রাজস্ব বৃদ্ধির পথ, তাহলে নীতিগত সহায়তা আদায় সহজ হয়।
২. প্রমাণভিত্তিক প্রস্তাব: আবেগ নয়, তথ্য…..
সরকারের কাছে সুবিধা চাইতে গেলে শুধু বক্তব্য যথেষ্ট নয়; দরকার ডাটা ও প্রমাণ। এফবিসিসিআই একটি শক্তিশালী রিসার্চ সেল গঠন করতে পারে, যারা নিয়মিতভাবে—
** কর কাঠামোর প্রভাব বিশ্লেষণ করবে।
** সুদের হার ও বিনিয়োগ প্রবণতা নিয়ে গবেষণা করবে।
** রপ্তানি খাতের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করবে।
যখন একটি প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত থাকবে পরিসংখ্যান, আন্তর্জাতিক তুলনা ও সম্ভাব্য রাজস্ব বৃদ্ধির হিসাব তখন সরকার তা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে বাধ্য হবে।
৩. বাজেট প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত অংশগ্রহণ….
প্রতিবছর জাতীয় বাজেট ব্যবসায়ীদের জন্য নির্ধারণ করে দেয় কর, শুল্ক, প্রণোদনা ও ভর্তুকির কাঠামো। এফবিসিসিআই যদি বাজেট ঘোষণার আগেই সংগঠিতভাবে সুপারিশ জমা দেয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনায় বসে, তাহলে অনেক দাবি বাস্তবায়ন সম্ভব।
উদাহরণস্বরূপ, যদি শিল্পখাতে গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয়ের উপর কর রেয়াত দেওয়া হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বাড়াবে, রপ্তানি বাড়াবে, অবশেষে কর রাজস্বও বাড়বে। এভাবে যুক্তি উপস্থাপন করলে সরকার বিষয়টি লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে দেখবে।
৪. এসএমই ও নারী উদ্যোক্তাদের পক্ষে সমন্বিত চাপ…
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME)। কিন্তু এই খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থায়ন, জামানত ও প্রশাসনিক জটিলতা। এফবিসিসিআই একটি সমন্বিত প্রস্তাব দিতে পারে:
** সিঙ্গেল উইন্ডো লোন প্রসেসিং
** সুদে প্রণোদনা
** ক্রেডিট গ্যারান্টি সম্প্রসারণ
একই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা সেল গঠন করে ব্যাংক ও সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে অংশগ্রহণ বাড়বে। সরকার যখন দেখবে যে এই খাতের বিকাশ কর্মসংস্থান বাড়াচ্ছে, তখন তারা নীতিগত সুবিধা দিতে আগ্রহী হবে।
৫. কর কাঠামো সংস্কার: রাজস্ব বাড়ানোর নতুন পথ….
অনেক সময় উচ্চ করহার রাজস্ব বাড়ায় না; বরং ব্যবসা সংকুচিত করে। এফবিসিসিআই সরকারের কাছে প্রস্তাব দিতে পারে—
** করহার যৌক্তিকীকরণ
** অপ্রয়োজনীয় ফি ও লাইসেন্স ফি কমানো
** ডিজিটাল ট্যাক্স ফাইলিং সহজীকরণ
ব্যবসা সহজ হলে করদাতার সংখ্যা বাড়ে। রাজস্বও বাড়ে। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে ছাড়, দীর্ঘমেয়াদে লাভ।
৬. আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও রপ্তানি সহায়তা…..
বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন—
** কম সুদ
** দক্ষ জনবল
** লজিস্টিক সুবিধা
** দ্রুত কাস্টমস প্রক্রিয়া।
এফবিসিসিআই সরকারকে বোঝাতে পারে যে রপ্তানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করবে। তাই রপ্তানি সংক্রান্ত যেকোনো সুবিধা রাষ্ট্রের জন্যও বিনিয়োগ।
৭. নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা
ব্যবসার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পূর্বানুমানযোগ্য নীতি (Policy Predictability)। যদি কর কাঠামো বা বিধিনিষেধ ঘনঘন বদলে যায়, বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়ে। এফবিসিসিআই সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে একটি ৫ বছর মেয়াদি ব্যবসা রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে, যাতে শিল্প ও বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারেন।
৮. জনমত গঠন ও মিডিয়া ভূমিকা
ব্যবসাবান্ধব নীতি কেবল লবিংয়ের মাধ্যমে আসে না; আসে জনমতের মাধ্যমে। এফবিসিসিআই যদি তথ্যভিত্তিক আলোচনা, সেমিনার, গোলটেবিল আয়োজন করে তাহলে একটি ইতিবাচক জনচাপ তৈরি হয়। সরকারও তখন ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
৯. ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রশাসনিক সহজীকরণ….
লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন, ট্যাক্স, আমদানি–রপ্তানি অনুমোদন, সব কিছু যদি ডিজিটাল ও সময়সীমাবদ্ধ করা যায়, তাহলে দুর্নীতি কমে ও গতি বাড়ে। এফবিসিসিআই সরকারকে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে। এতে ব্যবসার সময় ও খরচ কমবে। ফলে উৎপাদন বাড়বে, রাজস্বও বাড়বে।
পরিশেষে বলতে পারি উন্নয়ন একটি যৌথ যাত্রা, রাষ্ট্র ও ব্যবসা দুইটি আলাদা সত্তা নয়; একই অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমের দুই দিক। ব্যবসায়ী লাভবান হলে কর্মসংস্থান বাড়ে, কর বাড়ে, অবকাঠামো উন্নত হয়। সরকার লাভবান হলে নীতি ও নিরাপত্তা স্থিতিশীল হয়, যা আবার ব্যবসার জন্য সহায়ক।
সুতরাং এফবিসিসিআই–এর ভূমিকা হওয়া উচিত সেতুবন্ধন তৈরি করা, সংঘাত নয়, সমন্বয়; দাবি নয়, যুক্তি; চাপ নয়, অংশীদারিত্ব।
শেষ পর্যন্ত এটিই প্রতিয়মান হয়, ব্যবসায়ীর উন্নতি মানেই রাষ্ট্রের শক্তি বৃদ্ধি। আর শক্তিশালী রাষ্ট্রই টেকসই ব্যবসার নিশ্চয়তা দেয়। এই পারস্পরিক নির্ভরতার দর্শনকে সামনে রেখে যদি এফবিসিসিআই সুসংগঠিত, তথ্যসমৃদ্ধ ও কৌশলগত উদ্যোগ নেয়, তাহলে সরকারের কাছ থেকে ব্যবসাবান্ধব সুবিধা আদায় করা শুধু সম্ভবই নয়—অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
সাবিনা ইয়াসমীন
সম্পাদক রোদসী।
লেখক, কবি।





