ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে ------এফবিসিসিআই পরিচালক পদপ্রার্থী সাবিনা ইয়াসমিন

“আমরা যদি একে অপরের জন্যে কাজ না করি, আমরা এগোতে পারবো না…
বাংলাদেশের ব্যবসায়িক বাস্তবতায় এই কথাটি আজ আর কেবল আবেগের আহ্বান নয়—এটি একটি কঠিন বাস্তব সত্য। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, ডলারের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা আজ এক চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময় অতিক্রম করছেন। এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আলাদা আলাদা লড়াই করবো, নাকি একসাথে পথ খুঁজবো?
একজন ব্যবসায়ী কখনো একা সফল হয় না। তার সাথে জড়িয়ে থাকে কর্মচারী, সরবরাহকারী, পরিবেশক, গ্রাহক এবং একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক চেইন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা অনেক সময় নিজেদের প্রতিযোগী ভেবে একে অপরের থেকে দূরে থাকি, এমনকি সংকটের সময়েও সহযোগিতার হাত বাড়াতে দ্বিধা করি। অথচ বাস্তবতা হলো—আজ আপনি যে সমস্যার মুখোমুখি, কাল সেটিই অন্য একজনের সামনে দাঁড়াবে। তাই একে অপরকে সাহায্য করা মানে শুধু মানবিকতা নয়, এটি একটি বুদ্ধিমানের বিনিয়োগ। আমরা যদি নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করি, তাহলে অনেক সমস্যা আগেই সমাধান করা সম্ভব। একজন ব্যবসায়ী হয়তো কোনো নতুন বাজারে প্রবেশের কৌশল জানেন, আরেকজন হয়তো খরচ কমানোর কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। কেউ হয়তো ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে সফল, কেউ আবার রপ্তানিতে। এই জ্ঞানগুলো যদি আমরা নিজেদের মধ্যে বিনিময় করি, তাহলে পুরো ব্যবসায়ী সমাজই শক্তিশালী হয়ে উঠবে। কিন্তু আমরা যদি এই জ্ঞান নিজেদের মধ্যে আটকে রাখি, তাহলে আমাদের সম্মিলিত শক্তি কখনোই পূর্ণতা পাবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্বাস। আমরা অনেক সময় ভয় পাই—“আমি যদি আমার তথ্য শেয়ার করি, অন্য কেউ সেটা ব্যবহার করে আমাকে ছাড়িয়ে যাবে।” এই মানসিকতা আমাদের পিছিয়ে রাখে। উন্নত দেশগুলোতে ব্যবসায়ীরা নেটওয়ার্কিংকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে, তারা সহযোগিতার মাধ্যমে বড় হয়। আমাদেরও সেই মানসিকতা তৈরি করতে হবে। প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেটি যেন স্বাস্থ্যকর হয়, ধ্বংসাত্মক নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো। বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব শুধু নিজেদের মুনাফা বৃদ্ধি নয়, বরং পুরো ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করা। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি তখনই টেকসই হয়, যখন তার ছোট, মাঝারি এবং বড় সব স্তরের ব্যবসা একসাথে এগোয়। যদি বড়রা ছোটদের অবহেলা করে, তাহলে পুরো চেইন দুর্বল হয়ে পড়ে।
বর্তমান সময়ে আমরা একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি—ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, নতুন বাজারের সম্ভাবনা, কৃষি ও উৎপাদন খাতে নতুন দিগন্ত। এই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হলে এককভাবে নয়, সম্মিলিতভাবে এগোতে হবে। আমরা যদি একে অপরকে তথ্য, পরামর্শ এবং সুযোগ দিয়ে সহায়তা করি, তাহলে আমরা শুধু নিজেদের না, পুরো দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারবো।
এফবিসিসিআই-এর মতো প্ল্যাটফর্ম আমাদের জন্য একটি বড় শক্তি। এখানে দেশের বিভিন্ন খাতের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা একত্রিত হয়েছেন। এই প্ল্যাটফর্মকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা পরিচিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, এটিকে একটি কার্যকর সহযোগিতার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। আমরা যদি এখানে খোলামেলা আলোচনা করি, সমস্যার কথা বলি, সমাধানের পথ খুঁজি—তাহলেই এই প্ল্যাটফর্মের প্রকৃত মূল্য তৈরি হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে—সংকট কখনো স্থায়ী নয়। কিন্তু সংকটের সময় আমরা কীভাবে আচরণ করি, সেটিই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। যদি আমরা এই সময়ে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস, প্রতিযোগিতা এবং দূরত্ব বাড়াই, তাহলে আমরা সবাই দুর্বল হয়ে পড়বো। আর যদি আমরা সহযোগিতা, আস্থা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে বেছে নেই, তাহলে এই সংকটই আমাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে।
আজ আমাদের দরকার একটি মানসিক পরিবর্তন। “আমি” থেকে “আমরা”-তে আসা। নিজের সাফল্যের পাশাপাশি অন্যের সাফল্যেও আনন্দ পাওয়া। কারণ একজন ব্যবসায়ীর সাফল্য কখনো একক নয়—এটি একটি সম্মিলিত অর্জন।
শেষে একটি কথাই বলবো—
আমরা যদি একে অপরকে না ধরি, সত্যিই কেউ আমাদের ধরবে না।
কিন্তু আমরা যদি একসাথে দাঁড়াই, তাহলে কোনো সংকটই আমাদের থামাতে পারবে না।
আসুন, আমরা প্রতিযোগী না হয়ে সহযোগী হই।
আসুন, আমরা একে অপরের শক্তি হই।
কারণ একসাথে এগোলে—আমরা পারবোই।




